পহেলা বৈশাখ ও আমাদের আত্মপরিচয়ের লড়াই
তাহসিনুল বাকী ফাহিম
প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৩৯ পিএম
পহেলা বৈশাখ ও আমাদের আত্মপরিচয়ের লড়াই
পহেলা বৈশাখ শুধু একটি ক্যালেন্ডারের পাতা বদল নয়; এটি বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য, লড়াই এবং শুদ্ধ সংস্কৃতির মিলনমেলা। যখনই এই ভূখণ্ডে বাঙালির নিজস্বতা মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে, তখনই পহেলা বৈশাখ হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক।
বৈশাখের গোড়াপত্তন: খাজনা থেকে উৎসব
পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষের সূচনা প্রধানত অর্থনৈতিক কারণে। মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে হিজরি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী কর আদায় করা হতো। কিন্তু চান্দ্র মাস আর সৌর মাসের পার্থক্যের কারণে কৃষকদের ফসলের সময়ের সাথে করের সময় মিলত না। কৃষকদের সুবিধার্থে সম্রাট আকবর বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতুল্লাহ শিররাজিকে দিয়ে সৌর মাস ও চান্দ্র মাসের সমন্বয়ে ‘ফসলি সন’ বা বাংলা সনের প্রবর্তন করেন (১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দ)। সেই থেকেই শুরু হয় চৈত্র সংক্রান্তির বিদায় আর বৈশাখের আবাহন। ব্যবসায়ীরা তাদের দেনা-পাওনা চুকিয়ে শুরু করতেন 'হালখাতা', যা ছিল গ্রাম বাংলার এক প্রাণের উৎসব।
উৎসবের রূপান্তর: আগে ও এখন
আগের বৈশাখ ছিল অনেকটা গ্রামকেন্দ্রিক। নতুন জামা, মেলা, নাগরদোলা, আর ঘরে ঘরে তক্তি বা কদমার মিষ্টান্ন ছিল প্রধান অনুষঙ্গ। তবে আধুনিককালে এই উৎসব নাগরিক চেহারায় ধরা দিয়েছে। শহরগুলোতে ভোরের গান থেকে শুরু করে বড় বড় র্যালি এখন উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আগে যেখানে বৈশাখ ছিল কেবল কৃষি ও অর্থনীতির উৎসব, এখন তা হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক ও সামাজিক অপশক্তির বিরুদ্ধে এক সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ।
মঙ্গল শোভাযাত্রার ইতিকথা ও নাম রহস্য
মঙ্গল শোভাযাত্রা বাঙালির এক গর্বের অর্জন, যা ইউনেস্কোর স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। এর যাত্রা শুরু ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে। তখনকার সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে মানুষের মনে প্রশান্তি আর শুভবোধ জাগ্রত করার জন্য এই আয়োজন শুরু হয়।
কেন প্রতিকৃতি ও মুখোশ?
এই শোভাযাত্রায় দেখা যায় বড় বড় পাখি, বাঘ, ঘোড়া কিংবা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রতীকী কাঠামো। এর তাৎপর্য হলো অশুভ শক্তিকে পরাজিত করে শুভ শক্তির জয়গান করা। আলপনা আর কারুশিল্পে প্রকাশ পায় আমাদের লোকজ ঐতিহ্য।
নাম বদলের বিতর্ক
১৯৮৯ সালে এর নাম ছিল 'আনন্দ শোভাযাত্রা'। পরবর্তী সময়ে এটি 'মঙ্গল শোভাযাত্রা' নামে সর্বজনীন হয়ে ওঠে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক ও আদর্শিক মেরুকরণের কারণে এর নাম নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলছে। কেউ ধর্মীয় বা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে 'মঙ্গল' শব্দটি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, যার ফলে এ বছর ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নাম ব্যবহারের আলোচনা উঠেছে। তবে মনে রাখতে হবে, এটি কোনো ধর্মীয় আচার নয়, বরং বাঙালির সর্বজনীন লোকজ সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ।
পান্তা-ইলিশ: ঐতিহ্য না কি হুজুগ?
অনেকে মনে করেন পান্তা-ইলিশ ছাড়া বৈশাখ অসম্পূর্ণ। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় বৈশাখের সাথে ইলিশের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। চৈত্র-বৈশাখ মাসে জাটকা ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকে। বৈশাখে কৃষকরা পান্তা ভাত খেতেন কেবল শক্তির জন্য, কারণ এটি ছিল তাদের সাধারণ খাবার। কিন্তু গত কয়েক দশকে শহুরে কালচারে এটি একটি 'ফ্যাশন' হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের উচিত হুজুগে পড়ে ইলিশের প্রজনন ব্যাহত না করে বৈশাখকে তার সহজ-সরল রূপেই উদযাপন করা।
রাজনৈতিক ছোঁয়া থেকে রক্ষা ও আমাদের করণীয়
পহেলা বৈশাখ বাঙালির একমাত্র উৎসব যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এক হয়। এই উৎসবকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করা বা সংকীর্ণ ধর্মীয় বিতর্কে জড়ানো আত্মঘাতী।
১. উদার মানসিকতা: উৎসবকে ধর্মের চশমায় না দেখে সংস্কৃতির চশমায় দেখতে হবে।
২. হুজুগ বর্জন: কৃত্রিম আভিজাত্য (যেমন ইলিশ কেনা) বাদ দিয়ে গ্রাম বাংলার প্রকৃত মেলা আর কারুশিল্পকে গুরুত্ব দিতে হবে।
৩. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা যেমন পথ দেখিয়েছে, তেমনি প্রতিটি এলাকায় স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে যাতে এটি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আয়োজনে সীমাবদ্ধ না থাকে।
পহেলা বৈশাখ আমাদের শেকড়ে ফেরার ডাক দেয়। জীর্ণ পুরাতনকে ভুলে নতুন স্বপ্নে বুক বাঁধার নামই বৈশাখ। এই উৎসবের রঙ যেন কোনো রাজনৈতিক বা সাম্প্রদায়িক কালিতে ম্লান না হয়—আজকের দিনে এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।শুভ নববর্ষ!
