এআই যেভাবে বদলে দিচ্ছে ইরান যুদ্ধের চিত্র
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২৬, ০৩:০৭ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের চলমান সংঘাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি একটি সামরিক অভিযান শুরুর আগে মার্কিন সরকার তাদের একটি এআই প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে কাজ থেকে সরিয়ে দেয়। যুদ্ধক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের নৈতিকতা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞরা সম্প্রতি একটি বৈঠকে মিলিত হন। সেখানে আলোচনার মূল বিষয় ছিল যুদ্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য কি না। বিশেষ করে এমন অস্ত্র, যা মানুষের সহায়তা ছাড়াই নিজে থেকে লক্ষ্য নির্ধারণ করে আঘাত হানতে পারে, সেগুলো নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ মাইকেল হোরোভিটজের মতে, এআই প্রযুক্তি খুব দ্রুত এগিয়ে গেলেও তা নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণয়ন অনেক পিছিয়ে রয়েছে। আরেক বিশেষজ্ঞ ক্রেগ জোন্স সতর্ক করে বলেন, সময়মতো নীতিমালা তৈরি না হলে যুদ্ধক্ষেত্রে এআইয়ের অপব্যবহার ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে। তাঁর মতে, এআইনির্ভর যুদ্ধের ঝুঁকি এখন বাস্তবতার খুব কাছাকাছি।
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে সাধারণ মানুষের হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকায় মার্কিন সেনাবাহিনী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ডের প্রধান ব্র্যাড কুপার জানিয়েছেন, বিপুল পরিমাণ তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণের জন্য মার্কিন বাহিনী উন্নত এআই সরঞ্জাম ব্যবহার করছে।
আরো পড়ুন : যুদ্ধের খবর পছন্দ না হলে মিডিয়ার লাইসেন্স বাতিল করবেন ট্রাম্প
এই প্রযুক্তি সৈন্যদের সরঞ্জাম পরিবহন, গোপন তথ্য সংগ্রহ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করছে। ‘ম্যাভেন স্মার্ট সিস্টেম’ নামে একটি সফটওয়্যার ছবি বিশ্লেষণ করে শত্রুর অবস্থান শনাক্ত করতে পারে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের মতে, ইরানের ওপর হামলায় এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যদিও এর বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে এআই ব্যবহারের বিষয়টি মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সম্প্রতি দক্ষিণ ইরানের একটি স্কুলে বোমা হামলায় ১৭০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন, যাদের অধিকাংশই শিশু। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া অভিযানে এখন পর্যন্ত ইরানে অন্তত এক হাজার ৩০০ জন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
অনেকে মনে করেন, এআই ব্যবহারে লক্ষ্যবস্তুতে আরো নিখুঁতভাবে আঘাত করা সম্ভব, ফলে সাধারণ মানুষের প্রাণহানি কমতে পারে। কিন্তু বাস্তবে ইউক্রেন ও গাজায় ড্রোন হামলা কিংবা শত্রু শনাক্তকরণে এআই ব্যবহারের পরও বহু সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বিশেষজ্ঞ ক্রেগ জোন্সের মতে, এআই মানুষের মৃত্যু কমায়, এমন কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি বরং এতে ঝুঁকি বাড়তে পারে।
মানুষের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই আক্রমণ চালাতে পারে এমন স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়েও এখন বড় বিতর্ক চলছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অস্ত্রকে অবশ্যই সাধারণ মানুষ ও যোদ্ধার মধ্যে পার্থক্য করতে জানতে হবে। কিন্তু সম্পূর্ণ এআইনির্ভর অস্ত্র এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
ভবিষ্যতে সামরিক ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের নীতি নিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিকের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালে অ্যানথ্রোপিক তাদের ‘ক্লড’ নামের এআই ব্যবস্থা মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের ম্যাভেন সিস্টেমে সহায়তার জন্য প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি করেছিল।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে মার্কিন সরকার নতুন একটি নিয়ম জারি করে, যেখানে বলা হয় প্রয়োজনে সরকার যে কোনো আইনি কাজে বাধাহীনভাবে এআই ব্যবহার করতে পারবে। কিন্তু অ্যানথ্রোপিক এই শর্ত মানতে অস্বীকৃতি জানায়। কোম্পানিটির মতে, তাদের প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের ওপর নজরদারি বা সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র পরিচালনার কাজে ব্যবহার করা উচিত নয়, কারণ বর্তমান প্রযুক্তি এখনো ততটা নির্ভুল নয়।
এই মতবিরোধের জেরে ২৭ ফেব্রুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকারকে অ্যানথ্রোপিকের প্রযুক্তি ব্যবহার বন্ধ করার নির্দেশ দেন। বিশেষজ্ঞ মাইকেল হোরোভিটজ বলেন, এটি মূলত ভবিষ্যতে এআই ব্যবহারের নীতি ও সীমা নিয়ে মতপার্থক্যের ফল।
অন্যদিকে গত ১১ মার্চ চীন সামরিক কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অতিরিক্ত ব্যবহারের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা দিয়েছে। চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জিয়াং বিন এক বিবৃতিতে বলেন, অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করতে এআইকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা এবং মানুষের জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত অ্যালগরিদমের হাতে তুলে দেওয়া যুদ্ধের নৈতিকতা ও জবাবদিহি নষ্ট করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআইয়ের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার প্রযুক্তিকে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে। অনেকে আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে এটি কাল্পনিক চলচ্চিত্র ‘দ্য টার্মিনেটর’ এর মতো পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে, যেখানে একটি এআই ব্যবস্থা পারমাণবিক যুদ্ধের মাধ্যমে পৃথিবীকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। চীনের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় সামরিক ক্ষেত্রে এআইয়ের অতিরিক্ত ব্যবহার সেই আশঙ্কাকে আরও বাস্তব করে তুলছে।
সূত্র: নেচার জার্নাল
