×

জাতীয়

চামড়ার দরপতন

সারাদেশে চামড়া ফেলে দেওয়ার হিড়িক

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ২৯ মে ২০২৬, ০৯:৪৩ পিএম

সারাদেশে চামড়া ফেলে দেওয়ার হিড়িক

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের রাস্তায় এভাবেই পড়ে থাকতে দেখা যায় শত শত চামড়া। ছবি: সংগৃহীত

এ বছর কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারদর আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় সারাদেশে চামড়া ফেলে দেওয়া, নদী-খালে ভাসিয়ে দেওয়া এবং পচিয়ে নষ্ট করার ঘটনা ঘটেছে। ট্যানারি মালিক ও মৌসুমি ফড়িয়াদের সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত মজুত, এবং রপ্তানির অভাবে গরুর চামড়ার দাম নেমে আসে প্রতি পিস ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়, যা গত বছরের তুলনায় ৭০ শতাংশ কম। ছাগল ও ভেড়ার চামড়ার অবস্থা আরও করুণ, প্রতি পিস ১৫ থেকে ৩০ টাকায়ও ক্রেতা মেলেনি। জেলা প্রতিনিধি ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে পাওয়া তথ্যে উঠে এসেছে চামাড়া নষ্ট হওয়ার ভয়াবহ চিত্র।

রাজধানী ঢাকার যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, ডেমরা ও সাভারে শত শত চামড়া রাস্তার পাশে ও ডাস্টবিনে ফেলে রাখতে দেখা গেছে। যাত্রাবাড়ীর মাদরাসা মাঠে জমা হওয়া তিন শতাধিক চামড়া ক্রেতা না পেয়ে পচতে শুরু করলে সেগুলো সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়িতে তোলা হয়। কামরাঙ্গীরচরের বাসিন্দারা বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ে অন্তত ১৫০টি গরুর চামড়া পুঁতে ফেলেছেন। স্থানীয় এক মাদরাসার শিক্ষক বলেন, ‘এবার চামড়া বিক্রির টাকা দিয়ে এতিমখানার খরচ চালানোর পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু ৫০০ চামড়া জমা হলেও কেউ কিনতে আসেনি; বাধ্য হয়ে নদীতে ফেলে দিতে হয়েছে।’  

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বাকলিয়া ও চান্দগাঁও এলাকায় চামড়া ফেলে দেওয়ার ঘটনা সবচেয়ে বেশি। বাকলিয়া খালে অর্ধশতাধিক চামড়া ভেসে থাকতে দেখা গেছে, যা থেকে দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েন স্থানীয়রা। হাটহাজারী ও ফটিকছড়িতেও একই চিত্র। অনেকে পাহাড়ের ঢালে চামড়া মাটি চাপা দিয়েছেন। চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির এক নেতা জানান, ‘পরিবহন খরচের তুলনায় দাম এত কম যে চামড়া ঢাকায় পাঠানোই লোকসান।’  

রাজশাহীর পদ্মার চরাঞ্চল ও নগরীর তেরখাদিয়া এলাকায় চামড়া পচে নষ্ট হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা অন্তত ৪০০ ফেলে দেওয়া চামড়া সরিয়ে ফেলেছেন। পবা উপজেলার এক কৃষক জানান, ‘১০টি গরুর চামড়া ২ হাজার টাকায়ও বিক্রি করতে পারিনি; শেষমেশ বাড়ির পেছনে গর্ত খুঁড়ে পুঁতে ফেলেছি।’ 

খুলনায় রূপসা নদীর তীরবর্তী লবণচরা, বটিয়াঘাটা ও দিঘলিয়ায় নদীতে চামড়া ভাসিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। খুলনার ট্যানারি মালিকদের একটি অংশ দাম নির্ধারণী বৈঠক না করায় স্থানীয় ফড়িয়ারা চামড়া সংগ্রহেই আগ্রহ দেখায়নি। লবণচরার মৎস্যজীবী আলমগীর হোসেন বলেন, ‘জাল ফেলতে গিয়ে প্রায়ই পচা চামড়া উঠছে, নদীর পানি দূষিত হয়ে মাছ মরে যাচ্ছে।’

সিলেটের সুরমা নদীর পাড়, কোম্পানীগঞ্জ ও গোয়াইনঘাটে ছাগলের চামড়া ফেলে দেওয়ার প্রবণতা ছিল চোখে পড়ার মতো। সিলেটে ছাগলের চামড়ার দর ১৫ টাকায় নেমে আসায় অনেকে তা কুড়াতেও আগ্রহী হননি কেউ। স্থানীয় এক মাদরাসার ছাত্র জানান, ‘আমরা ২০০টি ছাগলের চামড়া জমা করে বস্তায় ভরে নদীর ধারে রেখে এসেছি, কেউ নেয়নি।’  

বরিশালের কীর্তনখোলা নদীর তীরবর্তী এলাকা ও বানারীপাড়ায় চামড়া পুঁতে ফেলার খবর পাওয়া গেছে। বরিশালে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের সংগঠন না থাকায় চামড়া কেনাবেচা একেবারেই স্তব্ধ ছিল। আগৈলঝাড়ার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জানান, ‘অনেক গরিব মানুষ লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণ করলেও পরে লোকসান গুনতে হয়েছে; শেষ পর্যন্ত সেগুলো পচে নষ্ট হয়েছে।’  

রংপুরে তিস্তা ও ঘাঘট নদীর তীরবর্তী কাউনিয়া, পীরগাছা ও মিঠাপুকুরে ব্যাপক চামড়া নষ্টের ঘটনা ঘটে। রংপুরের চামড়ার আড়ৎগুলো চালু না হওয়ায় দূর-দূরান্তের কোরবানিদাতারা চামড়া ফেলে যেতে বাধ্য হন। একটি বেসরকারি সংস্থার হিসাবে, জেলায় প্রায় ১,৫০০ চামড়া অপরিশোধিত অবস্থায় নষ্ট হয়েছে।  

ময়মনসিংহে ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়, ফুলপুর ও ভালুকায় চামড়া ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। ময়মনসিংহ সদরের একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ৭০০ চামড়া বিক্রির জন্য রাখলেও কোনো দরপত্র জমা পড়েনি। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক বলেন, ‘আমরা চামড়াগুলো সিমেন্টের বস্তায় ভরে নদে ডুবিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছি।’

কুমিল্লার গোমতী নদী ও নগরীর টমসম ব্রিজ এলাকায় পচা চামড়ার স্তূপ দেখা গেছে। কুমিল্লায় ছোট ট্যানারিগুলো বন্ধ থাকায় চামড়ার কোনো চাহিদাই তৈরি হয়নি। দাউদকান্দি উপজেলার এক ইমাম বলেন, ‘এলাকার গরিব পরিবারগুলোকে চামড়া দান করেছি, কিন্তু তারাও তা ব্যবহার না করতে পেরে শেষে ডোবায় ফেলে দিয়েছে।’

এছাড়া যশোরের কপোতাক্ষ নদ, বগুড়ার করতোয়া নদী, দিনাজপুরের পুনর্ভবা নদী, নোয়াখালীর চরাঞ্চল, টাঙ্গাইলের লৌহজং নদী এবং কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকায়ও শত শত চামড়া নদীতে ভাসছে, মাটিচাপা দেওয়া হচ্ছে বা পচে পরিবেশ দূষণ করছে।  

ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ট্যানারি মালিক সমিতি আগাম দাম নির্ধারণ না করায় চামড়ার বাজারে এই অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। পাশাপাশি দেশে কোরবানির পশুর সংখ্যা চাহিদার তুলনায় প্রায় ২০ লাখ বেশি হওয়ায় মজুত সংকট তীব্র হয়। তার ওপর আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার চাহিদা কমে যাওয়া, লবণের মূল্যবৃদ্ধি, এবং মৌসুমি ফড়িয়াদের কারসাজি পরিস্থিতি ঘোলাটে করেছে। সরকারিভাবে চামড়ার ন্যূনতম দাম নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সাড়ে ৪ ঘণ্টা পর সিলেটের সঙ্গে সারাদেশের রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক

সাড়ে ৪ ঘণ্টা পর সিলেটের সঙ্গে সারাদেশের রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক

মসজিদ কমিটি নিয়ে দু’পক্ষের সংঘর্ষ, আহত ৭

মসজিদ কমিটি নিয়ে দু’পক্ষের সংঘর্ষ, আহত ৭

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত নয়, খসড়ায় পরিবর্তন করার দাবি তেহরানের

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত নয়, খসড়ায় পরিবর্তন করার দাবি তেহরানের

বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ গেল বিএনপি নেতার

বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ গেল বিএনপি নেতার

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App