বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণ
পরিসংখ্যানে এক ভয়াবহ চিত্র
সেনচক্ষু স্যানাল
প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ০৯:২৬ এএম
ছবি: গত ১৬ মাসে দেশে ১ হাজার ৮৯০ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বাংলাদেশের শিশুদের জন্য এক ভয়াবহ বাস্তবতা উন্মোচন করেছে। গত ১৬ মাসে দেশে এক হাজার ৮৯০ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ৪৮৩ জন শিশু নিহত এবং এক হাজার ৪০৭ জন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আরও আতঙ্কজনক তথ্য হলো, এই সময়ের মধ্যে ৫৮০ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং ৩১৮ জন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। এই মর্মান্তিক পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়, এগুলো আমাদের সমাজের শিশুদের প্রতি চরম ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
এইচআরএসএস-এর প্রতিবেদন আরও জানায় যে গত ১৭ মাসে ২,৫০০-র বেশি নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ১,০১৬টি ধর্ষণের ঘটনা রয়েছে। এর মধ্যে ২৩০টি ছিল গণধর্ষণ。 দুর্বল আইন প্রয়োগ, অকার্যকর সরকারি পদক্ষেপ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর উদাসীনতাকে এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী করা হয়েছে।
বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণের আতঙ্কজনক বৃদ্ধির পেছনে একাধিক জটিল ও আন্তঃসম্পর্কিত কারণ কাজ করছে:
১. বিকৃত মানসিকতা ও যৌন প্রবৃত্তি: গবেষণায় দেখা গেছে, শিশু ধর্ষণের পেছনে প্রধান কারণগুলোর মধ্যে পুরুষালি মানসিকতা (৫৮ শতাংশ), যৌন আনন্দ (প্রায় ৬০ শতাংশ) এবং শারীরিক সৌন্দর্য (১২ শতাংশ) অন্যতম। অপরাধীরা অস্ত্র প্রদর্শন, ভয় দেখানো বা প্রলোভন দেখিয়ে শিশুদের ধর্ষণ করে তাদের যৌন প্রবৃত্তি চরিতার্থ করে。
২. দারিদ্র্য ও নিরাপত্তাহীনতা: দারিদ্র্যের কারণে অনেক শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বাস করতে হয়। পথশিশুরা বিশেষ করে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকা শহরের পথশিশুরা যৌন নিপীড়নের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। দারিদ্র্যপীড়িত পরিবার ও দুর্বল আইন প্রয়োগ শিশুদের অপরাধীদের সহজ শিকারে পরিণত করে।
৩. নিকটজনদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধ: উদ্বেগজনক তথ্য হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধর্ষক শিশুর পরিচিত কেউ। নিকটাত্মীয়, প্রতিবেশী, শিক্ষক, সহপাঠী, এমনকি পরিবারের সদস্যরাও ধর্ষণের সাথে জড়িত। এইচআরএসএস-এর তথ্যে দেখা যায়, ২০২৪ সালে ১,৪৯৯ জন নারী ও কিশোরী সহিংসতার শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ৫৫৮টি ধর্ষণের ঘটনা রয়েছে।
৪. অপ্রতুল আইন প্রয়োগ: দেশে ৪,৩৭৮টি শিশু নির্যাতনের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে ৬৬৪টি শিশুমৃত্যু। এই ব্যাপকতা দেখায় যে বিদ্যমান আইন ও বিচার ব্যবস্থা অপরাধীদের দমনে ব্যর্থ হচ্ছে। মামলা দীর্ঘায়িত হয়, এবং ধর্ষকরা রাজনৈতিক প্রভাবে মুক্তি পেয়ে যায়।
৫. শিশুদের প্রতি সহিংসতার সামাজিক স্বাভাবিকীকরণ: এইচআরএসএস-এর প্রতিবেদন স্পষ্ট করে যে লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতা বাংলাদেশের সমাজে প্রাত্যহিক জীবনে জড়িয়ে গেছে, সংস্কৃতি দ্বারা স্বাভাবিকীকৃত হয়েছে, এবং দুর্বল প্রয়োগ ব্যবস্থা দ্বারা টিকে আছে। এ বিষয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের জাতীয় ইনকোয়ারি কমিটি নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে করণীয় নির্ধারণে কাজ করছে।
৬. দায়মুক্তির সংস্কৃতি: ধর্ষকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া না-ওয়া, পরিবার ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের মীমাংসা করে ফেলার প্রবণতা, এবং সমাজের উদাসীনতা ধর্ষকদের নিরাপত্তার অনুভূতি জোগায়। বাংলাদেশে মাত্র ১৬ মাসেই ৫৮০ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে- এটি দায়মুক্তির সংস্কৃতিরই ফল।
৭. মাদকের অবাধ বিস্তার: সিনথেটিক ড্রাগস বিশেষ করে ইয়াবা ও আইসের অবাধ বিস্তার শিশু ধর্ষণের অন্যতম প্রধান কারণ। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২২ থেকে ২০২৫ এই চার বছরে যতগুলো ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে এর মধ্যে ৮৭% ধর্ষক মাদকাসক্ত ছিলো।
বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতন প্রতিরোধে বিদ্যমান আইন হলো ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০’ (সংশোধিত ২০২০ ও ২০২৫):
ধারা ৯: ধর্ষণের জন্য মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড
ধারা ৯(২): ধর্ষণের ফলে মৃত্যু ঘটলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ন্যূনতম ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড
ধারা ৯(৩): গণধর্ষণের জন্য প্রত্যেক ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
বিশেষ ট্রাইব্যুনাল: দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে প্রতিটি জেলায় শিশু ধর্ষণ অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান রয়েছে
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবেলায় জরুরি ভিত্তিতে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
১. জরুরি আইন প্রয়োগ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি: আইন অনুযায়ী দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ২০২৫ সালের সংশোধিত আইনে শিশু ধর্ষণের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে, যা অতি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। ২০২৪ সালে, ১,০১৬টি ধর্ষণের ঘটনার মধ্যে দ্রুত ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করা গেলে অপরাধীরা সতর্ক হবে।
২. জরুরি সহায়তা পরিষেবা জোরদারকরণ: সরকারি হেল্পলাইন নম্বরগুলো জনগণের মধ্যে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। এর মধ্যে জাতীয় হেল্পলাইন ১০৯ নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ২৪/৭ বিনামূল্যে সহায়তা প্রদান করে। আর চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮ দেশের যেকোনো প্রান্তের শিশু নির্যাতনের শিকার হলে এই নম্বরে ফোন করে সহায়তা চাওয়া যাবে।
৩. দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক নিরাপত্তা জাল: পথশিশু ও দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। তাদের জন্য আবাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। ইউনিসেফ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জন শিশু তাদের বাবা-মা এবং শিক্ষকদের দ্বারা শারীরিক শাস্তির শিকার হয়।
৪. কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসন: নির্যাতিত শিশুদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয় কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। ‘রংপুর সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র’-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশুদের প্রয়োজনীয় সেবা প্রদান করা জরুরি।
৫. সামাজিক সচেতনতা ও গণজাগরণ: বিদ্যালয় ও কমিউনিটি পর্যায়ে শিশু সুরক্ষা ও লিঙ্গ-সংবেদনশীলতা বিষয়ক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে গড়তে হবে সামাজিক প্রতিরোধ -এই আহ্বান শিশু একাডেমীসহ বিভিন্ন ফোরাম থেকে এসেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো সুরক্ষিত জায়গায়ও শিশুরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
৬. পারিবারিক ও কমিউনিটি দায়িত্ব: পরিবারের সদস্যদেরকেও সতর্ক থাকতে হবে, যাতে শিশুরা নিকটজনদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার না হয়। অভিভাবক ও স্থানীয় নেতাদের শিশু সুরক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
৭. আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়: স্বরাষ্ট্র, আইন, শিক্ষা, সমাজকল্যাণ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে, যার মধ্যে প্রতিরোধ, সনাক্তকরণ, বিচার ও পুনর্বাসন এই চারটি ধাপ যুক্ত থাকবে।
৮. তথ্য সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণ জোরদারকরণ: প্রতি বছর শিশু যৌন নির্যাতনের জাতীয় জরিপ পরিচালনা করতে হবে। "শিশু যৌন নির্যাতন: ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে দায়েরকৃত মামলার ওপর একটি গবেষণা"-র মতো আরও গবেষণা প্রয়োজন। এতে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে এবং নীতিনির্ধারণে সহায়ক হবে।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমান মানবাধিকার পরিস্থিতি গভীরভাবে উদ্বেগজনক। গত ১৬ মাসে ৫৮০ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হওয়া এবং এক হাজার ৪০৭ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়া- এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি জাতীয় বিপর্যয়।
বাংলাদেশের শিশুরা আজ এক ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ৪৮৩ জন শিশু হত্যা, ৫৮০ জন ধর্ষণ, ৩১৮ জন যৌন নিপীড়ন- এসব সংখ্যা শুধু তথ্য নয়, এগুলো এক একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত শৈশবের গল্প। আমাদের সমষ্টিগত ব্যর্থতার কারণেই এই শিশুরা তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এখনই সময় জেগে ওঠার, শিশুদের সুরক্ষায় জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার এবং তাদের একটি নিরাপদ, সুরক্ষিত শৈশব ফিরিয়ে দেওয়ার। আইনের যথাযথ প্রয়োগ, সামাজিক গণজাগরণ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমেই আমরা আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করতে পারি।
লেখক: চিন্তাবিদ
