দিভাষ কৃষ্ণ বিশ্বাসের এক জোড়া কবিতা
দিভাষ কৃষ্ণ বিশ্বাস
প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৬, ১০:৪৭ পিএম
দিভাষ কৃষ্ণ বিশ্বাসের এক জোড়া কবিতা
সে কাঁদে আর বলে
সে প্রতি রাতে কাঁদে।
মরণ তার হয়নি সেদিন।
তবু মৃত্যু কান্নায় বুক বাঁধে,
সে দেখেছে কালো রাতের পাক বেদুইন।
সেই পাক বেদুইন—
যারা আযান শুনেও থামায় নাই হত্যাখেলা।
আযানের সুর ছাপিয়ে বাজে গুলির আওয়াজ,
বুটের তলে মানবতা পিষে এগিয়ে চলে পাক হানাবাজ।
সেই রাত থেকে শুরু হল সবুজ বাংলায় রক্তমেলা।
সে কাঁদে আর বলে...
রাত তখন সাড়ে এগারো।
ফার্মগেটে মুক্তি মিছিলে প্রথম বুলেট-বৃষ্টি ঝরলো।
কালো কালো কুৎসিত সব পাঞ্জাবি পাক,
রাজারবাগে এসে দিল পুলিশের গায় অস্ত্রের ডাক।
শত শত বাংলার পুলিশেরে নিয়ে গেল মরণেরও তলে,
সে কাঁদে আর বলে।
সে কাঁদে আর বলে...
জহরুল হক, জগন্নাথের ছাত্র গুলো,
ঘুমায় ছিল,
হাসে আর মারে।
লাইন দিয়ে দাঁড়ায়ে তাদের
হাসে আর মারে।
লাশ গুলো টেনে নিয়ে কই যে চলে—
সে কাঁদে আর বলে।
সে কাঁদে আর বলে...
রোকেয়ায় আমার মায়েদের ঘর পোড়ায় দিল।
বেঁচে যারা বেরোয় এল,
বস্ত্র খুলে শরীর তাদের ছিঁড়ে খেলো—
ঐ বেজন্মা পাকি হায়না গুলো।
নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়ায়ে চলে।
সে কাঁদে আর বলে।
সে কাঁদে আর বলে...
বুদ্ধিজীবী শিক্ষকদেরে বাইরে এনে,
বউ বাচ্চার সামনে ট্রিগার দিল টেনে।
আর হত্যা সুখে বেওয়ারিশ পাক হেসেই চলে।
সে কাঁদে আর বলে।
কত হাজার মানুষ সেদিন হত্যা হল—
তাহার সাক্ষী খোদারে সে রাতই দিল।
মরেছে যে ঘুমের পথিক পাকির কাছে,
তার ছবিও রাতের মনে লুকায় আছে।
সে চিৎকার করে কাঁদে আর
চিৎকার করে বলে!
“আরে ও বাঙালি!
তোরা তো ভুলেই গেলি!
তোরা তো ভুলেই গেলি সে রাতের কান্না।
শাহজাহান তুমি আবার ধর সেই ওয়ারলেস,
আব্দুল আলী তুমি আবার বাজাও সে পাগলা ঘন্টা,
এ জাতিরে আবার জানাও কী হয়েছিল এ কালো রাতে!
কত পুত্রের লাশ ছিল কত মায়ের হাতে!
কত বাপের স্নেহের কন্যা পড়ে ছিল রাস্তার পাশে,
সে নগ্ন দেহের কান্না শব্দ আজও এ বাংলায় ভাসে!
হাজার লাশের মৃত্যুগন্ধ আজও হাহাকার করে রাতের বাতাসে।
তোরা কি শুনতে চাস না এই কালো রাত তোদের কি বলে!”
সে কাঁদে…
আর কালো রাতের রাজপথে
একাই হেঁটে চলে।
সাধনার স্বাধীনতা
অস্তিত্বের খোঁজে দ্বারে দ্বারে হাঁটে
এক মধ্যবয়সী সত্ত্বা,
সাড়ে চার যুগ অবসাদে কাঁদে—
সাধনার স্বাধীনতা।
পাবো বলে এক অবারিত মাটি,
রক্ত লেপে তারে করা হলো খাঁটি।
কত না যাতনা সয়েছিল দেশ!
প্রাণ জুড়ে এক স্বাধীন আবেশ
বেঁধেছিল বাসা মানুষের মনে।
প্রখর সমরে শত্রু দমনে
রুখেছি পরাধীনতা।
মা'য়ের জমিনে ছিনিয়ে এনেছি
অসাধ্য স্বাধীনতা!
শত্রুরা গেলো চলে।
স্বাধীনতা তবু দাঁড়াতে পারে না
গুপ্তবীজের ছলে।
আজ জীবন্ত দেহে পুড়ছে মানব,
পিশাচ নাচে, হাসছে দানব;
সুর, রঙ, লেখা কাঁদছে অসুখে।
উগ্র হায়না দৃঢ় সম্মুখে
ছিঁড়ে খায় মানবতা।
ফাঁসির বেদিতে নিরুপায় হায়
অর্জিত স্বাধীনতা।
হত্যার খেলা মিছিলে মিছিলে,
কলঙ্ক-মালা যোদ্ধার গলে,
জনকের মাথা পতিত ভূতলে,
মাতৃ-লজ্জা হাহাকার তোলে;
ভাষার বিধান অসৎ দখলে,
দুর্ভোগ নামে গুরুর কপালে।
অসারের দল করতেছে গোল—
কেউ নেই রুখবার।
স্বাধীনতা ফের মাটি কামড়েছে,
কারে যেন দরকার।
এক স্বাধীন ভোরের খোঁজে,
স্বাধীনতা মোর বিনিদ্র রহে
আঁচলে আস্য গুঁজে।
আশার সিদ্ধি ভারী!
সোনার স্বদেশে মুক্তির ভাষা
আনিবে যে কাণ্ডারী:
সে রণে নির্ভয়, বাংলার জয়
পত্তনে হুশিয়ার;
ধীরতার বল ধরেছে অটল—
সত্যের হাতিয়ার।
রুদ্র শপথ লইবে যে নিশি
কাণ্ডারী এক মনে,
শোণিত অরুণে ভস্মে লুটাবে
বঙ্গের দুশমনে।
কাণ্ডারী ডাকে মহোদধি বাঁকে—
জেগে উঠো মহাবীর!
হও অবিচল, প্রাণে আনো বল,
উন্নত রাখো শির।
তার পথ ধরে একে একে করে
জুড়িছে বঙ্গবাসী;
শুনেছি অদূরে বাউলের সুরে
স্বাধীন মুখের হাসি—
আমার সোনার বাংলা,
আমি তোমায় ভালোবাসি।
আমি তোমায় ভালোবাসি।
