শিকদার শাওনের এক জোড়া কবিতা
শিকদার শাওন
প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৬, ১১:৩২ পিএম
শিকদার শাওনের এক জোড়া কবিতা
স্বাধীনতা তুমি কার?
যে স্বাধীনতা চেয়ে
মেহেদীরঙ ফুরনোর আগেই নববধূ বিধবা হলো,
আমি দেখেছি সেই স্বাধীনতার অস্তমিত সূর্যে
সেই নববধূ আজ দাঁড়িয়ে আছে বিধবা ভাতার লাইনে।
তার শূন্য সিঁথির হাহাকারে
তুচ্ছ কয়টা টাকায় ঢাকা পড়ে যায় একাত্তরের ঋণ?
যে স্বাধীনতা চেয়ে
মেধাবী ছাত্রটি অবলীলায় বইয়ের ব্যাগ ছেড়ে কাঁধে তুলেছিল স্টোন গানের ওজন,
আজ তার গলায় শোভিত পাদুকা-হার!
আমি তার কুঁচকানো চামড়ায় পরাজয়ের মানচিত্র দেখি,
চুয়ান্ন বছরের অভিশাপে সে আজ এক বিষণ্ণ বয়োঃবৃদ্ধ;
যার প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস যেন ইতিহাসের এক-একটি রক্তাক্ত দলিল।
ঘৃণা লাগে যখন দেখি, দেশপ্রেম আজ পন্যের বিজ্ঞাপন,
যাদের রক্তে কেনা এই মানচিত্র, তারা আজ ফুটপাতে , প্রাসাদে উৎসব করে চেনা সেই ঘাতকের দল।
মেধা আর স্বপ্ন পচে মরে ক্ষমতার কালো অন্ধকারে।
চোখের পানি আজ থমকে আছে এক লোহিত সাগরে—
যে সাগরে ডুবে মরেছে আমাদের আজন্মের শ্রেষ্ঠ অঙ্গীকার।
আমি প্রশ্ন করি সেই রক্তস্ন্যাত সূর্যকে
বল, কার জন্য এই স্বাধীনতা? কার জন্য এই রক্তদান?
যদি মেধাবী ছাত্রটি আজ ভিখারি হয় নিজ দেশে,
তবে মুক্তি মানে কি শুধুই পতাকা বদলের হীন উল্লাস?
ভৈরব তীরের অগ্নীস্ন্যান
বিজয়ের রক্তিম আভায় মোড়ানো সতেরোই ডিসেম্বর।
যখন ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিষাদমাখা আত্মসমর্পণের দলিলে
নিয়াজীর কলম কেঁপে উঠেছিল লজ্জায় ও ঘৃণায়,
তখনও খুলনার মাটি কামানের গোলায় প্রকম্পিত, তপ্ত ও ধূসর।
হায়াত খান জানতেনই না পরাজয় কারে বলে,
কিংবা জানতেন বলেই,আটরা থেকে শিরোমণি অবধি বুনেছিলেন মাইন,
ট্যাঙ্ক আর গোলন্দাজ নিয়ে রচেছিলেন এক দুর্ভেদ্য ব্যূহ।
আমি দেখেছি, ভুলের মাশুল দিতে গিয়ে মিত্রবাহিনীর সেই রক্তস্নাত কনভয়,
চৌদ্দ মাইলে মেজর মহেন্দ্র সিং-এর সেই স্তব্ধতা
হিসাবের ভুলে নিজাগ্নীতে দগ্ধ মিত্রের পদাতিক,
সহযোদ্ধার তপ্ত রক্তে পবিত্র শিরোমণির মাটি,
ইতিহাস তো এক ধবমান অশ্বারোহী।
সবুজের বুক চিরে জেগে উঠলেন এক অকুতোভয় সেনানী-মেজর মঞ্জুর।
কৃষাণ সাজে , যেন এই বাংলারই এক রুদ্র কৃষক।
দুই হাতে দুইটি স্টেনগান,
ঝাপিয়ে পড়লেন ঘাতকের ট্যাঙ্কের ভেতর,
গুলির বৃষ্টি শেষে, স্তব্ধ দানবীয় লৌহকপাট,
দপ করে নিভে গেল ঘাতকের চোখ।
সেই রাতে শিরোমণির আকাশে নক্ষত্ররা ছিল পাহারাদার,
আর ভৈরব নদের ওপার থেকে ধেয়ে আসছিল
মুক্তির অদম্য জয়ধ্বনি।
অবশেষে ১৭ই ডিসেম্বর ভোরে,
সূর্য যখন নসু খানের ইটভাটার আড়াল থেকে
উঁকি দিয়ে দেখছিল এক নতুন পৃথিবী
তখন চার হাজার জল্লাদ নতমস্তকে ফেলে দিল
তাদের অহংকারী অস্ত্র।
মেজর জয়নাল আর দাদু ভাইয়ের হাতে যখন উড়ল আমাদের প্রথম সূর্য,
তখন সার্কিট হাউজের সেই পতাকাই বলে দিল
দেশ স্বাধীন হলেও, শিরোমণির ইতিহাস লেখা হয়েছিল বুকের রক্ত দিয়ে।
এখনও সেই ইটভাটার পাশে দাঁড়ালে শোনা যায়
রুদ্র কৃষাণে বেশে এক অকুতোভয় বীরের রণ হুঙ্কার,
যিনি একাই কবরস্থ করেছিলেন আস্ত এক ট্যাঙ্ক রেজিমেন্ট।
