অবহেলার ৫৪ বছর, আলোর খোঁজে সন্দ্বীপবাসী
মাহফুজ খান
প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬, ০৮:২৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
শতভাগ বিদ্যুতায়নের সরকারি দাবি ম্লান হয়ে গেছে চৌকাতলীর অন্ধকারে। এমপি অনুপস্থিত, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়ন হয়নি। চট্টগ্রাম নগরীর কোলঘেঁষা এই দ্বীপের আকাশপথে দূরত্ব মাত্র ১৬ কিলোমিটার হলেও, সন্দ্বীপকে আজও বয়ে বেড়াতে হচ্ছে ‘বিচ্ছিন্ন দ্বীপ’-এর তকমা। ২০১৮ সালে ১৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ পৌঁছানোর পরও সারিকাইত ইউনিয়নের চৌকাতলী গ্রামের মানুষের কাছে সে আলো এখনো এক রূপকথা। এই দ্বীপের জনগোষ্ঠী দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার ১২ শতাংশের জোগানদার, অথচ তাদেরই একটি বড় অংশ আজও নিমজ্জিত অন্ধকার, কাদা আর বিচ্ছিন্নতার যাতনায়।
সন্দ্বীপে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে বিতর্ক ও দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। পিডিবির প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে মিটার সংযোগে কোটি কোটি টাকা ঘুষ আদায়ের অভিযোগ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সরকারি ফি মাত্র ৭৬৮ টাকা হলেও গ্রাহকদের কাছ থেকে ৩ থেকে ১১ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায়ের প্রমাণ মিলেছে। ২০১৮ সালে সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ পৌঁছালেও গত পাঁচ বছরেও সন্দ্বীপের অর্ধেক মানুষ সংযোগ পায়নি।
চৌকাতলী গ্রামবাসীর দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তাদের এলাকায় বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের পরপরই রহস্যজনকভাবে সেগুলো খুলে নিয়ে যাওয়া হয়। গ্রামের কৃষক আব্দুল মজিদের আক্ষেপ, “আমাদের ভাগ্যতো অন্ধকার ছাড়া কিছু নাই। খুঁটি আসলে কিন্তু কাজে লাগলো না, হেইডাও নিয়া গেলো অন্য গ্রামে।”
সন্দ্বীপবাসীর ক্ষোভ শুধু বিদ্যুৎ নিয়ে নয়, তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিকে নিয়েও। চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনের সংসদ সদস্য মোস্তফা কামাল পাশা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ হয়ে দেশের বাইরে চিকিৎসাধীন। ২০২৬ সালের ২২ এপ্রিল জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল সন্দ্বীপের সাংসদের নাম ধরে ডাকলেও তিনি উপস্থিত ছিলেন না, যা নিয়ে ডেপুটি স্পিকার নিজেই হতাশা প্রকাশ করেন। নির্বাচনের পর থেকে এমপি কার্যত এলাকায় নেই। জানা গেছে, ২০২৬ সালের ২৩ এপ্রিল তিনি চিকিৎসার উদ্দেশ্যে থাইল্যান্ড যান। এমতাবস্থায় সন্দ্বীপবাসী কার্যত অভিভাবকহীন।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মোস্তফা কামাল পাশা সন্দ্বীপের উন্নয়নে ১৪ দফা নির্বাচনি অঙ্গীকার ঘোষণা করেছিলেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলো :
১. নৌ-পথের আধুনিকায়ন ও নিয়মিত ড্রেজিং।
২. আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা ও হাসপাতাল উন্নয়ন।
৩. ভাঙা সড়কগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পুনর্নির্মাণ।
৪. সন্দ্বীপকে সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত করা এবং মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণ।
নির্বাচনে ৭১ হাজারের বেশি ভোট পেয়ে বিজয়ী হওয়ার পরও স্থানীয়দের অভিযোগ, এই প্রতিশ্রুতির কোনোটিরই বাস্তবায়ন দেখা যায়নি।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান মন্তব্য করেছিলেন, “সন্দ্বীপ একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও সেখানে উন্নয়ন ঘটেনি। মানুষকে এখানে জিম্মি করে রাখা হয়েছে।” প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসও সন্দ্বীপে নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে না ওঠাকে ‘লজ্জার’ বলে অভিহিত করেছিলেন।
দ্বীপের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাও নাজুক। গত মার্চে ফেরি সার্ভিস চালু হলেও রাতে জরুরি রোগী পারাপারের ব্যবস্থা নেই। গত ৭ জুলাই রাতে কালাপানিয়া ইউনিয়নের ১২ বছর বয়সি শিশু আবদুর রহমান রাতে নৌযান না থাকায় চট্টগ্রাম পৌঁছাতে পারেনি এবং বিনা চিকিৎসায় মারা যায়। শুধু অন্ধকার নয়, অব্যবস্থাপনার কারণে বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে এ বছরই প্রাণ গেছে স্কুলছাত্র অপূর্ব ও কিশোর রাতুলের।
সারিকাইত ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বঞ্চনা ও গ্রামবাসীর ক্ষোভ তুলে ধরে প্রশাসনের কাছে একটি খোলা চিঠি দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন জুয়েল (গ্রাম : চৌকাতলী, সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম)।
চিঠিতে তিনি লিখেছেন, "আমরা সন্দ্বীপের মানুষ কি এই দেশের নাগরিক নই? যে সন্দ্বীপ দেশের ১২ শতাংশ রেমিট্যান্স দিয়ে অর্থনীতির চাকা সচল রাখে, সেই সন্দ্বীপের চৌকাতলী গ্রামের বৈদ্যুতিক খুঁটি নির্বাচনের পর খুলে নিয়ে যাওয়া হলো- এটা আমাদের সাথে চরম প্রতারণা। আমাদের শিশুরা ছয় মাস স্কুলে যেতে পারে না কাদার কারণে, রোগীরা বিনা চিকিৎসায় মারা যায়। অথচ আমাদের অভিভাবক এমপি মহোদয় চিকিৎসার জন্য বিদেশে অবস্থান করছেন। আমরা কার কাছে যাব? আমরা কোনো দয়া চাই না, আমরা আমাদের অধিকার চাই। মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার কাছে আমাদের আকুল আবেদন, আমাদের হারানো খুঁটিগুলো ফিরিয়ে দিয়ে দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবস্থা করা হোক এবং সন্দ্বীপ বাসীকে এই জিম্মিদশা থেকে মুক্তি দেওয়া হোক।"
চৌকাতলী গ্রামের আব্দুল মজিদ কিংবা আনোয়ার হোসেন জুয়েলের চিৎকার শুধু একটি বিদ্যুৎ সংযোগের দাবি নয়, এটি রাষ্ট্রের কাছে মৌলিক সেবার নিশ্চয়তা পাওয়ার অধিকার। সন্দ্বীপবাসী দেশ গড়ার কাজে অংশ নিয়েছে, রেমিট্যান্স পাঠিয়েছে, এখন তারাও চায় সমতা, চায় আলো।
