দিনিপ্রোর প্রাণীদের নীরব কান্না, যুদ্ধের আগুনে যখন নিভে যাচ্ছে কিয়েভের উষ্ণতা
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:০৬ পিএম
শীতের কিয়েভ। একসময় যেখানে জীবনের চঞ্চলতা ছিল, আজ সেখানে কেবল বরফের নিস্তব্ধতা। দিনিপ্রো নদী আজ যেন এক জমাট বাঁধা দীর্ঘশ্বাস। থার্মোমিটারের পারদ নেমেছে মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। চারদিকে শুধু সাদা বরফের চাদর। কিন্তু এই তীব্র হাড়কাঁপানো ঠান্ডার মাঝেও কোথাও প্রাণের স্পন্দন আছে।
এক চিলতে খোলা পানি, আর সেখানে জড়ো হয়েছে শত শত রাজহাঁস। তাদের শুভ্র ডানাগুলো আজ বরফের চেয়েও শীতল। তারা পরিযায়ী হয়নি, তারা রয়ে গেছে এই মাটির মায়ায়, হয়তো মানুষের ওপর ভরসা করে। ৬৪ বছর বয়সী ওকসানা ফেদিউশকিনা। এই তীব্র ঠান্ডাতেও তিনি নদীর পাড়ে এসেছেন পাখিদের জন্য খাবার নিয়ে। তার চোখে বিষণ্ণতা।
তিনি বলেন, এইখানটায় একটু বাকি, সব জমে পাথর হয়ে গেছে। পাখিগুলো তো এখানে উড়ে এসেছে আশ্রয়ের আশায়। তারা ২০ ডিগ্রি শীত হয়তো সয়ে নেয়, কিন্তু খাবার ছাড়া ওরা বড় অসহায়। বিগত কয়েক বছরের মৃদু শীত এই পাখিদের ভুলিয়ে দিয়েছিল কষ্টের স্মৃতি। তারা ভুলে গিয়েছিল দূরে কোথাও উড়ে যাওয়ার কথা।
আজ ওকসানার মতো কয়েকজনের ভালোবাসাই তাদের একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু যুদ্ধের এই সময়ে মানুষের নিজেরই যেখানে টিকে থাকা দায়, সেখানে এই অবুঝ প্রাণীদের দিকে হাত বাড়ানোর মতো মানুষ আজ বড্ড কম।
কিন্তু কিয়েভের আকাশ আজ কেবল মেঘে ঢাকা নয়, তা ঢাকা পড়েছে আতঙ্কে। যে রাতে তাপমাত্রা সবচেয়ে নিচে নামে, ঠিক সেই মুহূর্তটিকেই বেছে নেয় যুদ্ধ। রাশিয়ার ৪৫০টি ড্রোন আর ৬০টিরও বেশি মিসাইল ধেয়ে আসে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোর দিকে। গত মঙ্গলবার সকালে ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশ্চিত করেন এক ভয়াবহ তথ্য।
মেয়র ভিটালি ক্লিটস্কো জানান, কিয়েভের ১,১৭০টি আবাসিক ভবন এখন পুরোপুরি হিটিং বা তাপহীন অবস্থায় রয়েছে। কল্পনা করুন সেই বৃদ্ধ মানুষটির কথা, কিংবা সেই ছোট্ট শিশুটির কথা—যাদের ঘরে আজ কোনো উষ্ণতা নেই। বাইরে বরফ, ভেতরেও বরফ। বিদ্যুৎ নেই, পানি নেই, আছে শুধু এক অনিশ্চিত রাত।
এই হাড়কাঁপানো শীত আর অবিরাম কামানের গর্জন—সব মিলে কিয়েভ আজ এক রণক্ষেত্র। রাজহাঁসগুলো যেমন এক চিলতে খোলা পানির জন্য লড়াই করছে, কিয়েভের মানুষগুলোও তেমনি লড়াই করছে এক চিলতে স্বাধীনতার জন্য, সামান্য একটু উষ্ণতার জন্য।
প্রকৃতি হয়তো নিষ্ঠুর, মানুষ হয়তো আরও বেশি। কিন্তু এই ধ্বংসস্তূপের মাঝেও যখন কেউ পকেট থেকে এক মুঠো দানা বের করে পাখির দিকে ছুড়ে দেয়, তখন মনে হয়—মানবতা এখনো হারেনি। দিনিপ্রোর বরফ একদিন গলবে, রাজহাঁসগুলো আবার ডানা ঝাপটাবে মুক্ত আকাশে। কিয়েভ ফিরবে তার পুরনো ছন্দে। ততোদিন পর্যন্ত— বেঁচে থাকার এই লড়াই চলুক।
