সাংবাদিকদের ওপর হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন, আসামি গ্রেপ্তারে আল্টিমেটাম
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:৪১ পিএম
ছবি : ভোরের কাগজ
নরসিংদীতে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত সব আসামিকে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের আল্টিমেটাম দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব)।
সংগঠনের সভাপতি মির্জা মেহেদী তমাল হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে এজাহারভুক্ত আসামিদের ছবি আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রকাশ করতে হবে। অন্যথায় নরসিংদী জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) ও মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) অপসারণের দাবিতে বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) দুপুরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) প্রাঙ্গণে ক্র্যাবের আয়োজনে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বরাবর স্মারকলিপি দেওয়ার কথাও জানান ক্র্যাব সভাপতি।
মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে), ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ), ল’ রিপোর্টার্স ফোরাম, বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ), ডিফেন্স জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (ডিজাব), রিপোর্টার্স এগেইনস্ট করাপশন (র্যার্ক), পলিটিক্যাল রিপোর্টার্স ফোরাম, ঢাকা মেডিকেল রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, ট্রান্সপোর্ট রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, ঢাকা জার্নালিস্ট কাউন্সিলসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা সংহতি প্রকাশ করেন।
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলাম বলেন, নরসিংদীর ড্রিম হলিডে পার্কে ক্র্যাবের পিকনিকের বাসে চাঁদার দাবিতে স্থানীয় সন্ত্রাসীদের হামলার ঘটনায় সাংবাদিক সমাজ ক্ষুব্ধ। ঘটনার পর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা কিংবা আইজিপির পক্ষ থেকে ক্র্যাব নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি, আহতদের খোঁজও নেওয়া হয়নি—যা অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি অভিযোগ করেন, হামলাকারীরা চিহ্নিত চাঁদাবাজ এবং তাদের সঙ্গে পুলিশের যোগসাজশ রয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়ায় নরসিংদীর এসপি ও থানার ওসির অপসারণ দাবি করেন তিনি।
ডিইউজে সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম বলেন, ক্রাইম রিপোর্টাররা যখন হামলার শিকার হন, তখন দেশের পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ তা বোঝা যায়। ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তা স্পষ্ট—অতএব অবিলম্বে তাদের গ্রেপ্তার করতে হবে।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন ঘটনাটিকে ন্যাক্কারজনক আখ্যা দিয়ে বলেন, অবিলম্বে আসামি গ্রেপ্তার না হলে ঢাকা অচল করে দেওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। তিনি সরকারের সংশ্লিষ্টদের কার্যক্রমে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ার জন্য এই গাফিলতিই দায়ী।
প্রতিবাদ সভায় ক্র্যাবের সাধারণ সম্পাদক এম এম বাদশাহ বলেন, ভিডিও ও সিসিটিভি ফুটেজে শনাক্ত আসামিদের এখনো গ্রেপ্তার না করা প্রশাসনিক ব্যর্থতা। ঘটনার পরপরই অভিযান না চালিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করায় আসামিরা পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
ক্র্যাবের সাবেক সভাপতি খায়রুজ্জামান কামাল বলেন, পুলিশকে অবগত করা হলেও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। সাবেক সভাপতি মধুসূদন মণ্ডল বলেন, এজাহারে ১৩ জনের নাম থাকলেও এখন পর্যন্ত অল্প কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছে—বাকি আসামিদের ধরতে এত সময় লাগার কথা নয়।
আরেক সাবেক সভাপতি কামরুজ্জামান খান বলেন, ট্রিপল নাইনে কল করলে ১০ মিনিটের মধ্যে পুলিশের ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর কথা, কিন্তু এত বড় ঘটনার পর পুলিশ অনেক দেরিতে আসে, যা আরো ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়েছে।
ক্র্যাবের সাবেক সহসভাপতি শাহীন আব্দুল বারী বলেন, এ নির্মম হামলার দায় ড্রিম হলিডে পার্ক কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না। তাদের সঙ্গে স্থানীয় সন্ত্রাসীদের যোগসাজশ আছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানান তিনি।
ঢাকা জার্নালিস্ট কাউন্সিলের সভাপতি ইকরামুল কবীর টিপু বলেন, সাংবাদিকদের পিকনিকের গাড়িতে হামলার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থার প্রমাণ। জাতীয় প্রেসক্লাবের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য মো. মোমিন হোসেন বলেন, এটি পুলিশের চরম ব্যর্থতা এবং এর দায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের নিতে হবে।
ক্র্যাবের সহসভাপতি জিয়া খান আগামী ২৬ জানুয়ারি ‘ব্ল্যাক ডে’ ঘোষণার দাবি জানান। বিএসআরএফ সভাপতি মাসুদুল হক প্রশ্ন তুলে বলেন, আসামি ধরতে কেন মানববন্ধন করতে হবে—সরকার কি দেশে নেই? বিএসআরএফ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল্লাহ বাদল বলেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ক্র্যাবের সব কর্মসূচিতে তারা পাশে থাকবেন।
ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি হাসান জাবেদ বলেন, সাংবাদিকরা কর্মস্থল তো দূরের কথা, সামাজিক অনুষ্ঠানেও নিরাপদ নন—রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কোথায়, সেই প্রশ্ন উঠে। ডিজাব সভাপতি মো. আলমগীর হোসেন সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে হামলার মূল হোতাদের চিহ্নিত করার দাবি জানান।
র্যার্ক সভাপতি সাফিউদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। র্যার্ক সাধারণ সম্পাদক তাবারুল হক বলেন, এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতেই হবে।
পলিটিক্যাল রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি খোন্দকার কাওছার হোসেন বলেন, বারবার আবেদন সত্ত্বেও হামলাকারীদের গ্রেপ্তার না হওয়া উদ্বেগজনক। পিআরএফ সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ আলী বলেন, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন মেনে নেওয়া যায় না।
প্রতিবাদ সভায় আরো বক্তব্য দেন ঢাকা মেডিকেল রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন বাবু, ট্রান্সপোর্ট রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি আজিজুল হাকিমসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা। উপস্থিত ছিলেন ক্র্যাব ও ডিআরইউর বর্তমান ও সাবেক নেতৃবৃন্দ।
উল্লেখ্য, গত ২৬ জানুয়ারি নরসিংদীর ড্রিম হলিডে পার্কের সামনে ক্র্যাবের পিকনিকের বাসে চাঁদার দাবিতে হামলা চালায় স্থানীয় সন্ত্রাসীরা। এতে অন্তত ১০ জন ক্র্যাব সদস্য আহত হন, যাদের চারজনের অবস্থা গুরুতর। তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও নরসিংদী সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে বর্তমানে নিজ নিজ বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। এ ঘটনায় মাধবদী থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
