সৌদি আরবে চালু হচ্ছে ‘উটের পাসপোর্ট’, নেপথ্যে যে কারণ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:৩২ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
সৌদি আরব দেশটির লাখ লাখ উটের জন্য পাসপোর্ট ইস্যুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে মূল্যবান এই প্রাণীগুলোর পরিচয় সংরক্ষণ, মালিকানা নির্ধারণ এবং উট পালন খাতকে আরো সংগঠিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
সৌদি সরকারের পরিবেশ, পানি ও কৃষি মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে সবুজ রঙের একটি পাসপোর্টের নমুনা দেখিয়েছে। এতে সৌদি আরবের জাতীয় প্রতীক ও সোনালি রঙের একটি উটের ছবি রয়েছে। খবর বিবিসির।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সৌদি আরবে প্রায় ২২ লাখ উট রয়েছে। এরা দেশটির অর্থনীতিতে বছরে দুই বিলিয়ন রিয়ালের বেশি অবদান রাখে।
আরব নিউজের তথ্য বলছে, বিশ্বজুড়ে প্রায় সাড়ে তিন কোটি উট রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় এক কোটি সত্তর লাখ আরব বিশ্বে। উটের সংখ্যায় আরব দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে সোমালিয়া; এরপর রয়েছে সুদান, মৌরিতানিয়া, সৌদি আরব ও ইয়েমেন।
আরো পড়ুন : সৌদির প্রিন্স-তুরস্কের প্রেসিডেন্টের বৈঠক
উট সৌদি আরবের জাতীয় প্রতীকের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশটিতে উটের সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়, যেখানে সেরা উটগুলোকে পুরস্কৃত করা হয়। জাতীয় দিবসসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও আনুষ্ঠানিক আয়োজনে উটের উপস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের ইতিহাসে উটের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ শতকের শুরুর দিকে মক্কা ও মদিনায় যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল উট। আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া এবং পূর্বাঞ্চল থেকে আগত হাজিরা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে উটের পিঠে করেই সৌদি আরবে পৌঁছাতেন। মরুভূমির পরিবহনে উট ব্যবহারের ঐতিহ্য শতাব্দীর পর শতাব্দী পুরোনো।
গবেষণায় সৌদি আরবে পাথরে খোদাই করা উটের ভাস্কর্যের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেগুলো বিশ্বের প্রাচীনতম পশুচিত্রগুলোর মধ্যে একটি বলে ধারণা করা হয়। প্রথমে এগুলোর বয়স প্রায় দুই হাজার বছর মনে করা হলেও পরবর্তী গবেষণায় সাত থেকে আট হাজার বছর পুরোনো বলে নির্ধারণ করা হয়। গবেষকদের মতে, এগুলো প্রস্তর যুগেরও আগের হতে পারে এবং সম্ভবত যাযাবর জনগোষ্ঠীর মিলনস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
সৌদি ইতিহাসবিদ বদর বিন সৌদ বলেন, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে উট আরব উপদ্বীপের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর ভাষায়, উট ছাড়া এই শুষ্ক মরুভূমিতে টিকে থাকা কঠিন হতো। ইসলাম-পূর্ব যুগের কবিতা থেকে শুরু করে ধর্মীয় ইতিহাসেও উটের উল্লেখ রয়েছে। ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উট ‘কাসওয়া’র কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
আধুনিক যুগে পরিবহনে উটের ব্যবহার কমলেও সৌদি রাজপরিবারের সঙ্গে এই প্রাণীর সম্পর্ক এখনো গভীর। আধুনিক সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আবদুল আজিজের একটি উটের পাল ছিল। বাদশাহ সালমান এবং যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানেরও প্রিয় উট রয়েছে।
উটকে ‘মরুভূমির জাহাজ’ বলা হয়, কারণ এটি প্রায় ৪০০ কিলোগ্রাম পর্যন্ত বোঝা বহন করতে পারে। অতীতে বাণিজ্য কাফেলা উটের মাধ্যমেই সিরিয়া, ইয়েমেনসহ দূরবর্তী অঞ্চলে যাতায়াত করত। এমনকি কয়েক দশক আগেও তেল শিল্পের কিছু কাজে উট ব্যবহৃত হয়েছে।
বর্তমানে সৌদি আরব উটভিত্তিক শিল্পেও বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। ‘স্বানি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান উটের দুধ ও দুধের গুঁড়া উৎপাদন করে ২৫টি দেশে রপ্তানি করছে এবং উটের দুধের আইসক্রিম তৈরি করছে। অন্যদিকে ‘আবেল’ ব্র্যান্ড উটের লোম ও চামড়া দিয়ে পোশাক, ব্যাগ ও জুতা তৈরি করছে। কুমিরের চামড়ার পর উটের চামড়াকে সবচেয়ে টেকসই বলে বিবেচনা করা হয়।
সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে উট শিল্পকে তেলবহির্ভূত আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত করার লক্ষ্য রয়েছে। অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি এই উদ্যোগ দেশটির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্যের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
