বাংলাদেশিদের জন্য বিদেশগমনে ভিসা জটিলতা কেন বাড়ছে?
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:৫৫ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
বিদেশে পড়াশোনা, ভ্রমণ বা কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে ভিসা পেতে দীর্ঘদিন ধরেই নানা জটিলতার মুখে পড়ছেন বাংলাদেশের নাগরিকরা। ব্যক্তিগত অনিয়ম, দালালনির্ভরতা এবং দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা সব মিলিয়েই এই সংকট তৈরি হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ায় শিক্ষার্থী ভিসায় যাওয়ার সুযোগ পেয়েও শেষ পর্যন্ত যেতে পারেননি ঝিনাইদহের বাসিন্দা মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম। সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, সব ধরনের কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও তার আবেদন বাতিল হয়েছে। কিন্তু কেন তার ভিসা হলো না এর কোনো ব্যাখ্যা তিনি পাননি।
একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ ভিসার জন্য দীর্ঘদিন চেষ্টা করছেন ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা মোহাইমিনুল খান ও তার পরিবার। তিনি জানান, ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর ভিসা পাওয়া আরো কঠিন হয়ে গেছে। বাংলাদেশের নাম নতুন ভিসা বন্ড তালিকায় যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
ভিসা প্রসেসিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে কয়েকটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ভিসা আবেদনের সময় ভুয়া কাগজপত্র জমা দেওয়ার প্রবণতা। শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতার সনদ, প্রশিক্ষণ সনদ কিংবা ব্যাংক স্টেটমেন্ট জাল করার অভিযোগ প্রায়ই উঠে আসে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো ভ্রমণ ভিসায় বিদেশে গিয়ে অবৈধভাবে থেকে যাওয়া বা অন্য দেশে চলে যাওয়া। এতে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হন না, ভবিষ্যতে বৈধভাবে যেতে চাওয়া অন্যদের জন্যও ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা অবস্থা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কও বিবেচনায় নেওয়া হয়। বাংলাদেশের বর্তমান অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটও এই ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে বলে তারা মনে করেন।
আরো পড়ুন : গণভোটে 'হ্যাঁ' জিতলে সংবিধানে যা যা বদলে যাবে, নতুন যুক্ত হবে যেসব বিষয়
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশিদের ভিসা পাওয়ার হার কমেছে। ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক দেশ ভিসা দেওয়ার হার কমিয়েছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ দেশের শ্রমবাজারও কার্যত বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ থেকে প্রধানত সৌদি আরবেই কিছু জনশক্তি যাচ্ছে বলে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম জানান।
জাপান ও সিঙ্গাপুরে সীমিতসংখ্যক দক্ষ কর্মী গেলেও অন্য দেশগুলোতে সুযোগ কম বলে তিনি উল্লেখ করেন। পর্যটন খাতের সঙ্গে জড়িত ইরাম খান জানান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও চীনে কিছু মানুষ পর্যটন ভিসায় যাচ্ছেন। এছাড়া থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে ভিসা পাওয়া তুলনামূলক সহজ হলেও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর এটি নির্ভর করছে।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বিভিন্ন দেশ থেকে গড়ে প্রায় এক লাখ বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে গত আট বছরে অন্তত চার হাজার বাংলাদেশি ফেরত এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকেও গত এক বছরে প্রায় তিনশ জনকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, বিদেশ যেতে আগ্রহীদের প্রায় ৮০ শতাংশই দালাল বা মধ্যসত্ত্বভোগীর ওপর নির্ভরশীল। এসব দালাল অনেক সময় ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে দেয়, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনও এই পরিস্থিতির জন্য দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, এটি কোনো ব্যক্তি বা একক প্রতিষ্ঠানের দায় নয়, বরং পুরো সিস্টেমের সমস্যা।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ মনে করেন, ব্যক্তি ও রাষ্ট্র দু’পক্ষেরই দায় রয়েছে। ভুল তথ্য দেওয়া, বিদেশে গিয়ে আইন ভঙ্গ করা এবং দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সবকিছু মিলেই বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভিসার শর্ত লঙ্ঘন, জালিয়াতি এবং অবৈধ অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশি পাসপোর্টের ঝুঁকি-প্রোফাইল বেড়েছে। ফলে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই ও বায়োমেট্রিক পরীক্ষা করছে। সুশাসন ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে এই পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
